মাকে কিছু বোঝাতে গেলেই রেগে যান, কীভাবে সামলাব তাঁকে

স্টাফ রিপোর্টার 5 days ago 0 Comments Less than a minute
ইদানীং খেয়াল করছি, আমার মায়ের শরীর খুব একটা ভালো না, ওষুধও খাবেন না

ইদানীং খেয়াল করছি, আমার মায়ের শরীর খুব একটা ভালো না, ওষুধও খাবেন নাছবি: এআই/প্রথম আলো

ইদানীং খেয়াল করছি, আমার মায়ের শরীর খুব একটা ভালো না।

বেশ কিছুদিন হলো সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। দীর্ঘদিন নয়টা-পাঁচটা অফিস করে হঠাৎ পাওয়া অখণ্ড অবসরে ছেদ পড়েছে তাঁর দৈনন্দিন রুটিনে। অযথা রাত জাগছেন। সকালে ঘুম থেকে উঠছেন দেরি করে।

আগে নিয়মমতো নাশতা খেয়ে অফিসে ছুটতেন। অফিস না থাকায় সকালের নাশতা খাচ্ছেন দুপুরে। কখনো খাচ্ছেনও না। স্বাভাবিকভাবেই এসবের প্রভাব পড়ছে তাঁর শরীরে।

মুখে ‘না’ বললেও তাঁর দুর্বলতা বোঝা যাচ্ছে। হাঁটুর ব্যথা নিশ্চয়ই বেড়েছে। উঠতে–বসতে সময় নিচ্ছেন। কিন্তু বারবার বলার পরও ডাক্তারের কাছে যাবেন না কিছুতেই। এই বয়সে নিয়মিত চেকআপ করা খুবই জরুরি।

কিন্তু মাকে তা কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছে না। তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। জোরাজুরি করলে রাগ করে উল্টো ঝাড়ি দিয়ে বলবেন, ‘আমার বিষয়ে তোমার নাক গলাতে হবে না।’

নানা যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে যতই বোঝানো হোক, তিনি কিছুতেই কথা শুনবেন না।

শুধু আমার মা নন

শুধু যে আমার মা এমন আচরণ করেন, তা নয়। আশপাশে পঞ্চাশ-ষাটোর্ধ্ব অনেক মা-বাবার গল্পই এ রকম। কারও হয়তো মিষ্টি খাওয়া নিষেধ; কিন্তু তিনি ঠিকই মিষ্টি খেয়ে যাচ্ছেন।

সন্তান যেটায় বাধা দিচ্ছে, তাতেই রেগে বাড়াচ্ছেন ব্লাড প্রেশার। কেউ ঠিকমতো ওষুধ খান না। অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে যেতে চান না। করেন না ব্যায়াম কিংবা হাঁটাচলা।

শুধু যে আমার মা এমন আচরণ করেন, তা নয়। আশপাশে পঞ্চাশ-ষাটোর্ধ্ব অনেক মা-বাবার গল্পই এ রকম

শুধু যে আমার মা এমন আচরণ করেন, তা নয়। আশপাশে পঞ্চাশ-ষাটোর্ধ্ব অনেক মা-বাবার গল্পই এ রকমপ্রতীকী ছবির মডেল: শুভ ও উল্কা হোসেন। ছবি: সুমন ইউসুফ

আমার বন্ধু রাহাতের (ছদ্মনাম) সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করতেই ‘সহমত ভাই’ বলে লাফিয়ে উঠল। বলল নিজের অভিজ্ঞতা, ‘আমার আব্বা অনেক দূরের আত্মীয়দের কথায় গলে গিয়ে টাকাপয়সা দেন। আব্বার কাছে তো অত টাকা নেই। সেই টাকা আমাকে দিতে হয়। কিন্তু আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, তাদের আসলে আব্বার কাছে টাকা চাওয়ার মতো প্রয়োজন নেই। কিন্তু জানে যে চাইলে আব্বা “না” করতে পারবেন না, এটাকে নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে। এটা নিয়ে আব্বাকে বোঝাতে গেলেই আব্বা “টাকা দিবি না সেটা বল, এত কথার দরকার নাই” বলে রাগ করে কথা বন্ধ করে দেন।’

আরও পড়ুন

বাবা থাকলে জীবন কেমন হতো জানি না, তবে মা আমার সব শূন্যতা পূরণ করে দিয়েছেন

আরেক বন্ধু রাশেদ (ছদ্মনাম) পড়েছে অন্য বিপদে। তাঁর বাবা মোটামুটি সুস্থই আছেন। কিন্তু তাঁর সব সময় মনে হয় শরীর খারাপ। গুগল করে কোনো রোগের লক্ষণ মিলে গেলেই তিনি ডাক্তারের কাছে যেতে চান।

রাশেদের কথা, ‘কী আর করা, বাপ-মা যেতে চাইলে তো “না” করা যায় না। নিয়ে যাই। ডাক্তার দেখে বলে, “কোনো সমস্যা নেই। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না।” তখন আব্বু বলে, “ডাক্তার ভালো না। কিছু জানে না। কোনো টেস্ট তো দিল না। অন্য ডাক্তারের কাছে চল।” অন্য ডাক্তার টেস্ট দেয়। তখন আবার বলে, “শুধু শুধু টেস্ট দিল।” যতই বোঝাই, আব্বু, তুমি ঠিক আছ, তোমার কিছু হয় নাই, শুনবে না।’

সমস্যাটি গভীর

কারও হয়তো মিষ্টি খাওয়া নিষেধ; কিন্তু তিনি ঠিকই মিষ্টি খেয়ে যাচ্ছেন

কারও হয়তো মিষ্টি খাওয়া নিষেধ; কিন্তু তিনি ঠিকই মিষ্টি খেয়ে যাচ্ছেনছবি: প্রথম আলো

বয়স্ক মা-বাবাদের কেউ আবার বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে গ্রামে ঘর তুলতে চান, যেখানে কেউ কখনো থাকবে না। বাড়বে আত্মীয় কিংবা স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বিরোধ। অনেক মা-বাবা এসব নিয়ে নিজের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছেন। কিন্তু এ নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান কথা বলতে গেলেই তাঁরা বলে ওঠেন, ‘আমার চেয়ে বেশি বোঝো? খুব লায়েক হয়ে গেছ, তাই না?’

বৃদ্ধ মাকে রাত জাগতে নিষেধ করলে অনেক সন্তানকে শুনতে হয়, ‘আমি তোমাকে পেটে ধরেছি না তুমি আমাকে পেটে ধরেছ?’

ফলে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের দুশ্চিন্তার গ্রাফ সহজে নিচে নামছে না। কারণ, অন্য অনেক কিছুর মতোই তাঁরা সামলাতে পারছেন না বৃদ্ধ মা-বাবাকে। অথচ মা-বাবাই সন্তানকে পরিণত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন যেন তাঁদের দুর্বল মুহূর্তে সন্তান পাশে দাঁড়াতে পারে। সেই সময় যখন চলেই আসে, সন্তানও যখন পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব নিতে চায়, অনেক ক্ষেত্রেই মা-বাবা সেটা মানতে পারেন না।

আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে চাকরি করছি কয়েক বছর হলো, তাদের চায়ের আড্ডায় ক্রিকেট, ফুটবল, দেশ ও বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর ট্যুর প্ল্যানের মধ্যে একটা চিরস্থায়ী চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মা-বাবার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি।

চোখের সামনে তাঁদের বয়স বেড়ে যাওয়া কিংবা ক্রমবর্ধমান অসহায়ত্বটা কষ্ট হলেও মেনে নিই আমরা। কিন্তু তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই যে যৌক্তিক কথা শুনতে চান না, এটা মেনে নেওয়া আরও কঠিন।

মা-বাবা কেন কথা শুনতে চান না

মা-বাবা সন্তানকে পরামর্শ, আদেশ, আদর দিয়ে বড় করেছেন। একটা সময়ে এসে স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টা উল্টে যায়। যুগের পালাবদল, প্রযুক্তির উন্নতি কিংবা নিছকই পরিণতবোধ থেকে সন্তানেরা মা-বাবাকে নানা বিষয়ে সহায়তা করতে চায়। দিতে চায় পরামর্শ।

দীর্ঘদিন যে সন্তান তাঁদের কথামতো চলেছে, এখন তার কথা শুনতে হবে, এটা নিশ্চয়ই একটা ধাক্কার মতোই লাগে অনেক মা-বাবার কাছে। সন্তান বড় হচ্ছে, কিন্তু মা-বাবা তাদের আগের মতোই ছোট ভাবছেন।

এ ছাড়া আমাদের সমাজে পারস্পরিক আলোচনার অভ্যাস গড়ে না ওঠাও একটা বড় জটিলতা তৈরি করে। অনেক সন্তানই মা-বাবার সঙ্গে আলোচনা করতে পারে না।

সমস্যা কি শুধু আমাদের দেশেই

বয়স্ক মা–বাবার কোনো কিছুতে ‘না’ বলাটা শুধুই তাঁদের একগুঁয়ে আচরণ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু ভয়, কিছু অস্থিরতা

বয়স্ক মা–বাবার কোনো কিছুতে ‘না’ বলাটা শুধুই তাঁদের একগুঁয়ে আচরণ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু ভয়, কিছু অস্থিরতাছবি: প্রথম আলো

মা-বাবা কথা শুনতে চান না, এটা শুধু আমাদের এ অঞ্চলেরই সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিন, ‘সিএনএন’সহ অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেই বিষয়টি উঠে এসেছে। মা-বাবা কেন কথা শুনতে অনীহা প্রকাশ করেন, এর কারণ খুঁজতে পাঁচটি বিষয় তুলে ধরেছে ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিন।

তারা বলছে, বয়স্ক মা–বাবার কোনো কিছুতে ‘না’ বলাটা শুধুই তাঁদের একগুঁয়ে আচরণ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু ভয়, কিছু অস্থিরতা। কী সেসব?

  • নিজেদের চেনা পরিবেশ হঠাৎ অচেনা হয়ে যাওয়া। মা-বাবা যেসব কাজ করে অভ্যস্ত, হুট করে সেসব করতে না পারায় একধরনের অস্তিত্ব সংকটে ভোগেন।
  • নিজেদের শারীরিক বা মানসিক ক্ষমতা যে কমে আসছে, সেটা বুঝেও মানতে চান না।
  • যেকোনো ধরনের পরিবর্তনকে ভয় পান।
  • সন্তানদের পরামর্শ পেলে তাঁরা ধরে নেন যে তাঁরা আরও নাজুক হয়ে পড়েছেন কিংবা জীবনের শেষ দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
  • সবকিছুর ওপর তাঁদের যে নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেটা চলে যাচ্ছে মনে করে একধরনের চরম দুশ্চিন্তা বোধ করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *