গুম করে কীভাবে রাখা হয়েছিল, নিজের বয়ানে বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার 8 years ago 0 Comments Less than a minute

‘আমি বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না—এমন ভয়ও পেয়েছিলাম।’ গুমের ৬১ দিনের ভয়াবহ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে কথাগুলো বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

ভারতে উদ্ধারের পর পরিবারের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগের স্মৃতিও তাঁকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। মুঠোফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী কীভাবে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন, সেই ঘটনারও স্মৃতিচারণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আজ শনিবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে নিজে গুমের শিকার হওয়ার ঘটনা নিয়ে এভাবে স্মৃতিচারণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।

আলোচনার শিরোনাম ছিল, ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাঁদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সালাহউদ্দিন আহমদ রাজধানীর উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন। তখন তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের পদে ছিলেন।

বিএনপি তখন অভিযোগ করে, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নিয়ে গেছে। এর ৬২ দিন পর ১১ মে সিলেটের সীমান্ত লাগোয়া ভারতের মেঘালয়ে শিলংয়ের পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। তখন ভারতের পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সালাহউদ্দিন শিলংয়ে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় লোকজনের ফোন পেয়ে তাঁকে আটক করা হয়।

বাংলাদেশে ৬১ দিন গুম

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাঁকে একটি ছোট কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। কক্ষটি ছিল ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের মতো। সেখানে একটি পানির কল ছিল। শৌচকার্যের জন্য ছিল একটি চিকন ছিদ্র। সেটি নালার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে তাঁর ধারণা। সেখান থেকে দুর্গন্ধ আসত।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মেঝেতে একটি কম্বল বিছানো ছিল। সেটিই ছিল শোবার জায়গা। একটি বালিশও ছিল। স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর কোনো পরিবেশ ছিল না।’

তাঁকে এক বেলা নাশতা ও দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, পানিও দেওয়া হতো; কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। তাঁর হার্টের সমস্যা ছিল।

দরজার বাইরে সব সময় একটি বৈদ্যুতিক পাখা চলত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দরজার ওপর সামান্য ফাঁকা জায়গা ছিল। সেখান দিয়ে বাতাস আসত।’ সেই বাতাস না থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দম বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা হতো বলে মনে করতেন তিনি।

সালাহউদ্দিন বলেন, একদিন খাবার দিতে এসে তাঁর কোনো সাড়া না পেয়ে আটককারীরা দরজা খোলে। তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়।

চোখ বেঁধে বাংলাদেশ থেকে ভারতে

গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ২৯ আগস্ট
গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ২৯ আগস্টছবি: প্রথম আলো

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চোখ বাঁধা অবস্থায় তাঁকে একটি গাড়িতে তোলা হয়। গাড়ির দরজা খোলার শব্দ শুনে তিনি বুঝেছিলেন, সেটি মাইক্রোবাসের মতো। কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে চলার পর একটি জায়গায় থামানো হয়।

সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করানো হয়। পরে রাত গভীর হলে আবার গাড়িতে তোলা হয়। রাস্তার অবস্থা পায়ের স্পর্শ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন তিনি। পরে জিপের মতো একটি গাড়িতে তাঁকে নেওয়া হয়। এরপর আরও একটি জায়গায় নিয়ে গিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে কিছু মানুষের কথাবার্তা শুনতে পান। দীর্ঘ সময় তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। একপর্যায়ে এক কর্মকর্তা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কামরুজ্জামান সাহেবের ( মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত) তো এক্সিকিউশন হয়ে গেছে।’ ৬১ দিন ধরে আটক থাকায় বাইরের কোনো খবর তাঁর জানা ছিল না। এ কথা শুনে ওই কর্মকর্তা অবাক হন। পরে তাঁকে খাবার দেওয়া হয়। সারা দিন কিছু না খাওয়ায় তিনি খাবার চান। তাঁকে নুডলস দেওয়া হয়। তখনো তাঁর হাত বাঁধা ছিল। হাত বাঁধা অবস্থায় চামচ দিয়ে তাঁকে খেতে হয়। প্রস্রাবের প্রয়োজন হলে অনেক কষ্টে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর তাঁকে আরও কয়েক ঘণ্টা রাখা হয়। পরে তাঁর চোখ খুলে দেওয়া হয়; কিন্তু যাঁরা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন আবার তাঁরা নিজেদের চোখ ঢেকে রাখেন, যাতে তিনি তাঁদের চিনতে না পারেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পরে আমাকে একটি নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়। তখন সূর্য ওঠার সময়। পাশে বড় একটি ফাঁকা জায়গা ছিল। সেখানেই আমাকে রেখে যাওয়া হয়।’

আরও পড়ুন

৯ বছর পর ভারত থেকে দেশে ফিরলেন বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন

৯ বছর পর ভারত থেকে দেশে ফিরলেন বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন

‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কয়েকজন মানুষকে দেখে তিনি তাঁদের কাছে জায়গাটির পরিচয় জানতে চান। তিনি হিন্দি ও ইংরেজিতে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন; কিন্তু তাঁকে দেখে তাঁরা প্রথমে মানসিক ভারসাম্যহীন বা পাগল মনে করেছিলেন। পরে সালাহউদ্দিন পাশের একটি বিলবোর্ড দেখে বুঝতে পারেন, তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে আছেন। পরে তিনি স্থানীয় লোকজনদের পুলিশে খবর দেওয়ার অনুরোধ করলে কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ এসে তাঁকে নিয়ে যায়।

পুলিশ তাঁকে একটি থানায় নিয়ে যায় উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সেখানে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে একটি বেসামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসককে নিজের পরিচয় ও টেলিফোন নম্বর দিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধও করি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *